সুনামগঞ্জ , রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬ , ২৯ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
প্রধানমন্ত্রী সিলেট আসছেন ২ মে এগারো দলীয় জোটের ভবিষ্যৎ কী সমন্বিত প্রচেষ্টায় বিচারিক কাজকে আরো কার্যকরের আহ্বান পাথারিয়া ইউপি ভবন নির্ধারিত স্থানে বাস্তবায়নের দাবিতে সভা পানির তোড়ে ভেঙে যাওয়া বাঁধ রক্ষা করলেন হাজারো কৃষক গণশুনানিতে বদলাচ্ছে রাজনীতির ধরণ, আলোচনায় এমপি কামরুল জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন বিল সংসদে পাস কোথাও ধান কাটার উৎসব, কোথাও জলের নিচে স্বপ্ন মুক্তিপণ নেয়ার পরও অপহরণকারীরা ফেরত দেয়নি মোনায়েমকে, উৎকণ্ঠায় পরিবার টাঙ্গুয়ার হাওরে ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প কমিউনিটি ভিত্তিক স্বপ্ন কি টিকে থাকবে? দিস ইজ নট শাহবাগ স্কয়ার, দিস ইজ পার্লামেন্ট : হাসনাত আব্দুল্লাহকে স্পিকার সংসদে ১৩ দিনে ৯১টি বিল পাস শাল্লায় নিরীহ পরিবারের বাসা দখলে ঘোষণা দিয়ে হামলা ত্যাগী নেত্রীদের মূল্যায়ন চায় বিএনপি’র তৃণমূল দালালের ফাঁদে নিঃস্ব অভিবাসন প্রত্যাশীরা, হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা দিরাইয়ে পৃথক সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ২০ ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার জুলাইযোদ্ধাদের দায়মুক্তি দিয়ে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিল’ পাস শান্তিগঞ্জে ফসল রক্ষা বাঁধ কর্তন পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক, মেরামতের নির্দেশ উদ্বোধন হলো ‘মা ও শিশু হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’

অচেনা চৈত্র ও হাওরে জলাবদ্ধতা

  • আপলোড সময় : ১২-০৪-২০২৬ ০৯:৫৯:৫৩ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১২-০৪-২০২৬ ১০:০০:৪৩ পূর্বাহ্ন
অচেনা চৈত্র ও হাওরে জলাবদ্ধতা
প্রফেসর মোশাহাদত হোসেন::
বাংলাদেশে এপ্রিল উষ্ণতম মাস। ভয়াবহ গরমের কথা মনে করাতে বাংলায় একটি বিখ্যাত প্রবচন আছে, “চৈত্র মাসের গরমে কুত্তা পানিত নামে”। প্রচ- খরতাপে মাঠঘাট সব শুকিয়ে যায়, মানুষ বৃষ্টির জন্য হাহাকার করতে থাকে। এসময় শহুরে মানুষ এসি রুমে আর গ্রামের মানুষ গাছতলায় বসে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। এটিই বাংলাদেশের চিরচেনা চৈত্র-বৈশাখ, এটিই আমাদের চিরচেনা এপ্রিল। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিল যেন এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। গত কদিন ধরে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। অঝোর ধারায় বৃষ্টির পতন দেখে মনে হয়, এ যেন বর্ষাকাল। ইতিমধ্যে হাওরে বৃষ্টির পানি জমে ফসলি জমি ধান ক্ষেত তলিয়ে গেছে। কৃষকের হাসি গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে কান্নায় পরিণত হয়েছে। বন্যা নয়, জলাবদ্ধতায় কৃষকের সকল স্বপ্ন-সুখ ডুবে যাচ্ছে। সাধারণত কয়েক বছর পর পরই হাওরাঞ্চলের কৃষককে এমন অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। প্রকৃতি নিজস্ব নিয়মে চলে। এ যেমন মানুষের জীবনে নানা প্রতিকূলতা সৃষ্টি করে, তেমনি দুরবস্থা থেকে উত্তরণের পন্থাও ঠিক করে দেয়। তাই হাওরে যতদিন মানুষের আঘাত পড়েনি, ততদিন জলাবদ্ধতা নিরসনেও তেমন কোন সমস্যা হয়নি। অতীতেও আগাম বৃষ্টি হয়েছে, চৈত্র-বৈশাখ মাসে হাওরে পানি জমেছে। কিন্তু নিষ্কাশন খাল দিয়ে সে পানি নদীতে নেমেও গিয়েছে। ফলে ফসলের বড় কোন ক্ষতি হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধের নামে অপরিকল্পিত ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাঁধ নির্মানের ফলে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। শক্ত ও ব্যয়বহুল বাঁধের কারণে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে হাওরের জমা পানি বের হতে পারছে না। ফলে বন্যা না হয়েও হাওরাঞ্চলের ধানের জমি ডুবে কৃষকের ক্ষতি হচ্ছে। হাওরাঞ্চলগুলো যেহেতু নি¤œ জলাভূমির অন্তর্ভুক্ত, তাই ফসল রক্ষার জন্য বাঁধ তৈরি করা অপরিহার্য। কিন্তু ফসলরক্ষার এসব বাঁধ হতে হবে পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মত; যতটা সম্ভব হাওরের ক্ষতি কম করে। সুনামগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলের সুশীল সমাজ দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিতে বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব দিয়ে আসছে। বর্তমান পদ্ধতিতে ফসলরক্ষা বাঁধ তৈরির ফলে হাওরের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু তথাপি হাওরাঞ্চলের মানুষের প্রস্তাব গ্রহণ করা হচ্ছে না। বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে ফসল রক্ষার জন্য প্রতিবছর হাওরের তীরে মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হয়। হাওরের যেসব জায়গা নদীর নিকটে ও দুর্বল যেসব স্থানে সাধারণত বাঁধ নির্মাণ করা হয়, যেন বন্যার পানি হাওরে প্রবেশ করতে না পারে। তবে এসব বাঁধের মাটি আনা হয় হাওরের তীরবর্তী কান্দা বা শক্ত জায়গা থেকে। এভাবে মাটি আনার ফলে কান্দার মত নিরাপদ জায়গাও ক্রমেই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, অতীতের নিরাপদ এসব জায়গা দিয়েও পানি ঢুকে হাওরের ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। এভাবে আরো কয়েক বছর মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হলে প্রতিটি হাওরের চারপাশই অনিরাপদ হয়ে যাবে। তাতে ফসলরক্ষা বাঁধের ব্যয়ও বাড়বে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছর পর বাঁধ তৈরির মাটিও পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে হাওররক্ষা বাঁধগুলো বর্ষায় পানিতে তলিয়ে যায়। তলিয়ে যাওয়া বাঁধের মাটি তখন পার্শ্ববর্তী হাওর বা নদীতে জমা হয়। এতে হাওর ও নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে পানি নিষ্কাশনের ক্ষমতা কমে যায়, বন্যার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। শুধু তাই নয়, হাওরের তীরবর্তী কান্দা থেকে মাটি কাটার ফলে হাওরাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে, জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে, গাছপালা কমে যাচ্ছে, গরুর চারণভূমি হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে বাঁধের মাটি হাওরে বা নদীতে পড়ে তলদেশ ভরাট হওয়ায় মৎস্য স¤পদ ও জলজ উদ্ভিদের ক্ষতি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য হাওরাঞ্চলের সুশীল সমাজ পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মত বাঁধ নির্মাণের উপর জোর দিয়ে আসছেন। সেক্ষেত্রে মাটির বাঁধের পরিবর্তে কংক্রিটের স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা যেতে পারে। কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণ করলে সেগুলোকে রাস্তা হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব হবে। তবে বাঁধে ঘন ঘন কালভার্ট নির্মাণ করতে হবে, যেন পানি নিষ্কাশনে কোন সমস্যা না হয়। পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে কংক্রিটের বাঁধ সুফলের পরিবর্তে কুফল বয়ে আনবে। হাওরের ফসল রক্ষায় মাটির বাঁধের পরিবর্তে কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণ করা অবশ্যই ব্যয়বহুল, তবে তা অসম্ভব নয়। প্রতি বছর যদি মোট বাঁধের ১০% কংক্রিটের নির্মাণ করা হয়, তাহলে ১০ বছর পরে পুরো হাওর এলাকার বাঁধ কংক্রিটের হয়ে যাবে এবং হাওরে তখন আর বাঁধের জন্য কোন ব্যয় করতে হবে না। বিগত ৫০ বছরে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের জন্য যে খরচ করা হয়েছে, তার চেয়ে কম টাকায় কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণ শেষ হয়ে যেত। তবে অনেকের মতে, হাওরের ফসলরক্ষার মাটির বাঁধ পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রিয় প্রজেক্ট। কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণের ফলে এটি বন্ধ হয়ে গেলে তাদের দুঃখ-কষ্ট বেড়ে যাবে। তাই স্থায়ী সমাধানে তাদের আগ্রহ কম। অন্যদিকে প্রতিটি হাওরে এক বা একাধিক স্লুইস গেইট নির্মাণ করা হাওরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। কোন এক অজানা কারণে এ দাবিও গুরুত্ব পাচ্ছে না। অথচ হাওরের ভিতর পানি বৃদ্ধি পেলে তা নদীতে নামানোর জন্য কিংবা নদীর পানি সঠিক সময়ে হাওরে প্রবেশ করানোর জন্য স্লুইস গেইটের কোন বিকল্প নেই। হাওরের ফসল ও মৎস্য স¤পদ রক্ষার জন্য স্লুইস গেইটের কোন বিকল্প নেই। আমাদের মনে রাখতে হবে হাওরের পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য অন্য সাধারণ এলাকার মত নয়। তাই হাওরাঞ্চলের মানুষকে বাঁচাতে হলে এর জন্য আলাদা ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দরকার। সেজন্য হাওর নিয়ে গবেষণা করতে হবে, ভবিষ্যতের কথা ভেবে পরিকল্পনামাফিক বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর যে ভূমিকা রাখার কথা ছিল তা রাখতে পারেনি। এখন সংস্থাটিকে কার্যকর ও শক্তিশালী করে হাওরের মানুষের উন্নয়নে কাজে লাগানো আবশ্যক। সংস্থাটির পরিকল্পনা তৈরিতে যেন হাওর পারের অভিজ্ঞ মানুষের অংশগ্রহণ থাকে সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

[লেখক : প্রফেসর মোঃ শাহাদত হোসেন, অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ]

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স